শহীদ আজগর খান রাহাত

৩০ নভেম্বর -০০০১ - ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ | ১৪৭

বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির

শাহাদাতের ঘটনা

“গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ফেসবুক স্ট্যাটাসে রাহাত খান লিখেছেন, ‘আজ সারা বাংলাদেশে শহীদ হওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে..., হে আল্লাহ তোমার অতি নগণ্য বান্দা হিসেবে আমায় তুমি কবুল কর। এই স্ট্যাটাস দেয়ার প্রায় ২১ ঘণ্টা পর ১৬ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ১০টায় পুলিশের ছোড়া একটি গুলি আলী আজগর খান রাহাতের বুকের বাম পাশে ঢুকে পিঠ দিয়ে বের হয়।’ ‘শহীদি মরণের’ স্বপ্নে বিভোর যুবক দীর্ঘ ৯ দিন মৃত্যুশয্যায় থাকার পর তার প্রতিদিনকার স্বপ্ন-কামনা-চাওয়ার কাড়িত পথে পা বাড়ান। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। উল্লেখ্য, গত ১১ ফেব্রুয়ারি ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন একটাই কামনা.../একটাই স্বপ্ন..../ একটাই চাওয়া..../ একটাই মুক্তির পথ..../শহীদি মরণ..../ ১২ ফেব্রুয়ারি ফেসবুকে স্ট্যাটাসে দিয়েছেন, আল্লাহ তুমি আমাকে তোমার দ্বীনের পথে শহীদ হওয়ার তাওফিক দাও.... আমিন।”

শহীদের পরিচিতি
শহীদ আলী আসগর খান রাহাত সিলেটের দক্ষিণ সুরমার কায়েস্তরাইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। আমেরিকা প্রবাসী পিতা সুলেমান খান ও মাতা নুরজাহান বেগমের সন্তান শহীদ আলী আসগর খান রাহাত। তিনি ৩ ভাই ও ৪ বোনের মধ্যে সবার ছোট মাত্র ২২ বছরের এক তরতাজা তরুণ । তিন ভাইয়ের মধ্যে বড় ভাই সেলিম খান সরকারি কর্মকর্তা, দ্বিতীয় ভাই শাকিল মা-বাবার সাথে আমেরিকা থাকেন। মেধাবী রাহাত ইসলামী ছাত্রশিবিরের সদস্য এবং মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত- সিলেট মহানগর ছাত্রশিবিরের সহ-সমাজসেবা সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন।

নগরীর দক্ষিণ সুরমার ২৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা আলী আসগর খান রাহাত ২০০৪ সালে কায়েস্তরাইল উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ২০০৬ সালে মদন মোহন কলেজ থেকে বাণিজ্য বিভাগে এইচএসসি পাস করেন। এ বছরেই তিনি একই কলেজে অনার্সে (ব্যবস্থাপনা) ভর্তি হন। ২০১২ সালে অনার্স ফাইনাল পরীায় অংশগ্রহণ করেন তিনি। এই অল্প বয়সে তার এই নির্মম মৃত্যুতে মদন মোহন কলেজের সকল ছাত্রছাত্রী এবং শিকমণ্ডলী এবং এলাকার জনগণ শোকাহত। তারা রাহাত হত্যাকারী দোষী সেই সমস্ত পুলিশ সদস্যদের বিচার দাবি করেন।

যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে গেলেন
শুধু রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতেই নামে-বেনামে তথাকথিত ট্রাইব্যুনাল সাজিয়ে আন্তর্জাতিক প্রহসনের বিচার মঞ্চস্থ করছে সরকার। সর্বশেষ বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে তারা অন্যায়ভাবে বিচারের নামে আন্তর্জাতিক নাটক মঞ্চসস্থ করতে চলেছে। এই অন্যায়ের প্রতিবাদে গোটা বিশ্ববাসী আজ প্রতিবাদমুখর। এরই অংশ হিসেবে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার কক্সবাজারে আয়োজিত মিছিলে গুলি করে শিবিরের ৩ নেতাসহ মোট ৬ জনকে খুন করে এই স্বৈরাচারী সরকার। এর প্রতিবাদে পরের দিন শনিবার দুপুরে আয়োজিত সিলেট ছাত্রশিবিরের শান্তিপূর্ণ মিছিলে নগরীর নয়াসড়ক-মিরবক্সটুলা সড়কে পুলিশ পেছন দিক থেকে সম্পূর্ণ বিনা উসকানিতে গুলি চালায়। মুহূর্তের মধ্যেই শিবির নেতা রাহাত খানসহ আরও ১০-১২ নেতাকর্মী রাজপথে লুটিয়ে পড়েন। প্রথমে তাদেরকে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে আলী আসগর রাহাত খানের অবস্থার অবনতি হলে তাকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সযোগে ঢাকায় পাঠিয়ে এ্যাপোলো হাসপাতালে ভর্তি করা হয় ও লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। এরপর তার শরীরে দুই দফা অস্ত্রোপচার করা হয়। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ তারিখ শনিবার রাতে তৃতীয় দফা তার ফুসফুসে অস্ত্রোপচার করেন হাসপাতালের ডাক্তাররা। এরপর থেকে তার আর জ্ঞান ফেরেনি। ২৫ ফেব্রুয়ারি সোমবার সকাল ১০টা থেকে তার রেসপিরেটরি সিস্টেম (শ্বাসক্রিয়া) পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। দুপুর ১টার দিকে ডাক্তাররা তার লাইফ সাপোর্ট মেশিন খুলে নেন। ঠিক ১টা ৫ মিনিটেই তাকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকেরা।

তার শাহাদাতের বিস্তারিত বিবরণ
গত ১৫ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার কক্সবাজারে আয়োজিত মিছিলে গুলি করে শিবিরের ৩ নেতাসহ মোট ৬ জনকে খুন করে এই স্বৈরাচারী সরকার। এর প্রতিবাদে পরের দিন শনিবার দুপুরে আয়োজিত সিলেট ছাত্রশিবিরের শান্তিপূর্ণ মিছিলে নগরীর নয়াসড়ক-মিরবক্সটুলা সড়কে পুলিশ পেছন দিক থেকে সম্পূর্ণ বিনা উসকানিতে গুলি চালায়। মুহূর্তের মধ্যেই শিবির নেতা রাহাত খানসহ আরও ১০-১২ নেতাকর্মী রাজপথে লুটিয়ে পড়েন। জাতীয় দৈনিক ও সাপ্তাহিকসমূহে এ বিষয়ে বিস্তারিত নিউজ আসে যার কিঞ্চিৎ এখানে দেয়া হলো।

দৈনিক সংগ্রাম; ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩
সিলেটে শান্তিপূর্ণ মিছিলে পেছন থেকে পুলিশের গুলি : গুলিবিদ্ধ ৫ আহত ২০ ॥ আজ অর্ধদিবস হরতাল, গুলিবিদ্ধ মহানগর শিবির নেতা রাহাত খান সঙ্কটজনক অবস্থায়
সিলেট ব্যুরো : কক্সবাজারে সাঈদী মুক্তি পরিষদের মিছিলে পুলিশের গুলিবর্ষণে ৩ জন নিহত হওয়ার প্রতিবাদে ইসলামী ছাত্রশিবির সিলেট মহানগরের উদ্যোগে শান্তিপূর্ণ মিছিলে সিলেট কতোয়ালি থানা পুলিশ নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করে। কোতোয়ালি থানার অতি-উৎসাহী অফিসার ইনচার্জ আতাউর রহমান বাবুলের নির্দেশে শান্তিপূর্ণ মিছিলে পেছন থেকে পুলিশ গুলি চালায়। গতকাল শনিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে নগরীর চৌহাট্টাস্থ আরএন টাওয়ারের সামনে থেকে শুরু হওয়া মিছিলে পুলিশ কমপক্ষে ৫০ রাউন্ড শটগানের গুলিবর্ষণ করে। পুলিশের গুলিতে মহানগর শিবির নেতা রাহাত খান ও ছাদিক আহমদসহ ৫ জন গুলিবিদ্ধ হন। রাহাতের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকায় এয়ার অ্যাম্বুলেন্সযোগে পাঠানো হয়েছে। অন্য ৪ জন গুলিবিদ্ধ শিবিরকর্মীকে স্থানীয় হাসপাতালে এবং আহতদের নগরীর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। শিবির সন্দেহে নগরীর বিভিন্ন জায়গা থেকে পুলিশ কমপে ২০ জনকে আটক করেছে।

দৈনিক সংগ্রাম, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩
এলাকায় শোকের ছায়া : ঢাকা থেকে লাশ আসার পর জানাযা
রোজাদার অবস্থায় সিলেটে পুলিশের গুলিতে আহত শিবির নেতা রাহাত ঢাকায় মারা গেছেন
কবির আহমদ, সিলেট : গত ১৬ ফেব্রুয়ারি শনিবার সকাল সাড়ে ১০টায় সিলেট নগরীর নয়াসড়ক এলাকায় ইসলামী ছাত্রশিবিরের শান্তিপূর্ণ মিছিলে পুলিশের গুলিতে রোজাদার অবস্থায় আহত শিবির নেতা আলী আজগর খান রাহাত গত রোববার বেলা দেড়টায় ঢাকা মহানগরীর এ্যাপোলো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিলো ২৩ বছর। আজ মঙ্গলবার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রাহাতের ময়নাতদন্ত- শেষে সিলেটে লাশ আসার পর তার জানাযার নামায অনুষ্ঠিত হবে। লাশ আসার ওপর নির্ভর করছে রাহাতের জানাযার নামাযের সময়সূচি। আমেরিকা প্রবাসী সোলেমান খান ও মিসেস খানের সর্বকনিষ্ঠ পুত্র রাহাত খান ছিলেন একজন নির্বিবাদী তরুণ সমাজসেবী। এলাকার আওয়ামী লীগ-বিএনপি-জামায়াত-জাতীয় পার্টিসহ গোটা এলাকাবাসী শোকে নিথর হয়ে আছেন। বিচার দিলাম সকল বিচারকের শ্রেষ্ঠ বিচারক মহান রাব্বুল আলামিনের কাছে। এলাকায় যেন শোকের ছায়া নেমে এসেছে। কায়েস্থরাইল গ্রামের যুবলীগ নেতা সাহেদ আহমদ জানান, রাহাত খানকে আমরা আমাদের পরিবারের সদস্য মনে করতাম। যদিও দু’জন দুই রাজনৈতিক দল করি এবং আমার বয়সে অনেক ছোট কিন্তু সে ছিলো আমার আপন ভাইয়ের মতো। কায়েস্তরাইল গ্রামসহ গোটা এলাকাবাসী একজন মেধাবী ও নির্বিবাদী তরুণ সমাজসেবীকে হারিয়েছে। এই তি সহজে পূরণ হওয়ার কথা নয়। নগরীর দক্ষিণ সুরমার ২৫ নম্বর ওয়ার্ডের কায়েস্তরাইল গ্রামের বাসিন্দা রাহাত খান ২০০৪ সালে কায়েস্তরাইল উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ২০০৬ সালে মদন মোহন কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা উত্তীর্ণ হয়ে একই কলেজে ম্যানেজমেন্ট (অনার্স) প্রথম বর্ষে ভর্তি হন। ২০১২ সালে মেধাবী রাহাত ম্যানেজমেন্ট অনার্স ফাইনাল পরীায় অংশগ্রহণ করে ফলাফল প্রকাশ হওয়ার আগেই সকলকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন। কায়েস্তরাইল গ্রামের বিশিষ্ট সমাজসেবী শহীদ রাহাত খানের গর্বিত পিতা সোলেমান খান সস্ত্রীক আমেরিকায় থাকেন। গতকাল সোমবার তিনি দেশে ফিরে এসেছেন। রাহাত ৪ বোন ও ৩ ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট। বোন ৪ জনেরই বিবাহ হয়ে গিয়েছে। ৩ ভাইয়ের মধ্যে বড় ভাই সেলিম খান সহকারী শিাকর্মকর্তা (এটিইও), মেজো ভাই শাকিল খান আমেরিকায় বসবাস করেন। রাহাতও কিছু দিনের মধ্যে আমেরিকায় চলে যাওয়ার কথা। মেধাবী রাহাত খান ইসলামী ছাত্রশিবিরের সদস্য ছিলেন এবং মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত- নগর শিবিরের সহসমাজসেবা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছিলেন। পুলিশের সাথে সংঘর্ষের দিন রাহাত নফল রোজা রেখে ছিলেন। প্রায়ই তিনি নফল রোজা রাখতেন।

দৈনিক মানবজমিন, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩
সিলেটে গুলিবিদ্ধ রাহাত ও সুহিনের মৃত্যু
মঙ্গলবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩
সিলেট অফিস : সিলেটে গুলিবিদ্ধ রাহাত ও সুহিন মারা গেছেন। রাহাত মারা গেছেন ঢাকার এ্যাপোলো হাসপাতালে, সুহিন সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। গত ১৬ ফেব্রুয়ারি হরতাল চলাকালে নগরীর নয়াসড়ক এলাকায় পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হয়েছিলেন তিনি। এ সময় শিবির নেতা রাসেলও গুলিবিদ্ধ হন। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর রাহাতকে প্রথমে সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। গুলির আঘাতে তার লিভার তিব্রক্ষতিগ্রস্ত হয়। অবস্থার অবনতি হলে ওই দিন বিকালে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সযোগে তাকে ঢাকা এ্যাপোলো হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তার শরীরে কয়েক দফা অস্ত্রোপচার হয়। অস্ত্রোপচারের পর তার অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলেও গত ২-৩ দিন ধরে আবার অবস্থার অবনতি হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত- গতকাল সকাল সাড়ে ১১টার দিকে তিনি মারা যান। নিহত রাহাত দক্ষিন সুরমার কায়েস্তরাইল গ্রামের আমেরিকা প্রবাসী সোলেমান খানের ছেলে। ৪ ভাই ও ৩ বোনের মধ্যে রাহাত সবার ছোট। তিনি মদনমোহন কলেজের অনার্স ৪র্থ বর্ষের ছাত্র।

স্বপ্নই ছিল শাহাদতবরণের

শাহাদতবরণের জন্য শিবির নেতা রাহাত খান মহান আল্লাহর দরবারে প্রতিনিয়ত প্রার্থনা করতেন। তার সকল সহপাঠীকে প্রায়ই তিনি জানাতেন শাহাদতের মৃত্যুর চেয়ে আর উত্তম মৃত্যু হয় না। শাহাদতের পেয়ালা পানের জন্য এই তরুণ বিভোর ছিলেন। এই ধরনের প্রার্থনা করার পর গত ১৬ ফেব্রুয়ারি ২১ ঘণ্টা পর পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হন ইসলামী আন্দোলনের এই মর্দে মুজাহিদ এবং ৯ দিন ঢাকার এ্যাপোলো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থেকে গত সোমবার তিনি তার মহান রবের দরবারে চলে যান। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ফেসবুক স্ট্যাটাসে রাহাত খান লিখেছেন, ‘আজ সারা বাংলাদেশে শহীদ হওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে... হে আল্লাহ তোমার অতি নগণ্য বান্দা হিসেবে আমায় তুমি কবুল কর।’

এই স্ট্যাটাস দেয়ার প্রায় ২১ ঘণ্টা পর ১৬ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ১০টায় নগরীর চৌহাট্টায় ‘আরএন’ টাওয়ারের সামনে থেকে কক্সবাজারে পুলিশের গুলিতে ৩ জন নেতাকর্মী নিহত হওয়ার প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল বের করে সিলেট মহানগর শিবিরের নেতাকর্মীরা। মিছিলটি ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কমপক্ষে ৫০ রাউন্ড শটগানের গুলি, টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট ছুড়ে।

পুলিশের ছোড়া একটি গুলি আলী আজগর খান রাহাতের বুকের বাম পাশে ঢুকে পিঠ দিয়ে বের হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় প্রথমে তাকে ওসমানী হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে রাহাতের অবস্থায় অবনতি হলে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকার এ্যাপোলো হাসপাতালে নেয়া হয়। ‘শহীদি মরণের’ স্বপ্নে বিভোর যুবক দীর্ঘ ৯ দিন মৃত্যুশয্যায় থাকার পর গত সোমবার সকাল সাড়ে ১১টায় তার প্রতিদিনকার স্বপ্ন-কামনা-চাওয়ার কাড়িত পথে পা বাড়ান। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। হযরত শাহজালালের পুণ্যভূমির রক্তভেজা ময়দান আবারও রাহাতের রক্তে লাল হয়ে রেখে গেল ইতিহাস এমনটাই মনে করেন তার রাজনৈতিক সহকর্মীরা।
উল্লেখ্য, গত ১১ ফেব্রুয়ারি ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন, ‘একটাই কামনা.../একটাই স্বপ্ন../ একটাই চাওয়া.../ একটাই মুক্তির পথ.../শহীদি মরণ...। ১২ ফেব্রুয়ারি ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন, আল্লাহ তুমি আমাকে তোমার দ্বীনের পথে শহীদ হওয়ার তাওফিক দাও..... আমিন। ১৩ ফেব্রুয়ারি ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন, এসো এসো এসো বন্ধু কুরআনের পথে করি সংগ্রাম। বাতিলের বির"দ্ধে আওয়াজ তুলি। উড্ডীন করি- আল্লাহর নাম।”

দৈনিক সংগ্রাম, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩
সিলেট সরকারি আলিয়া মাদরাসা ময়দানে জানাযায় লাখো মানুষের ঢল
চোখের পানি ও হৃদয় নিংড়ানো ভালবাসায় সিক্ত হয়ে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন শহীদ রাহাত
কবির আহমদ, সিলেট : লাখো মানুষের অজস্র চোখের পানি ও ভালোবাসায় চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন সিলেট মহানগর শিবিরের সহসমাজকল্যাণ সম্পাদক শহীদ আলী আজগর খান রাহাত। মাত্র কয়দিন আগে যে মাঠে দাঁড়িয়ে তাফসির মাহফিলে ‘নারায়ে তাকবির’-এর স্লোগান তুলেছিলেন, ঠিক সেই জায়গায় লাখো জনতা অশ্রুসিক্ত হৃদয়ে চিরবিদায় দিলেন রাহাতকে।
সিলেটের ঐতিহাসিক আলিয়া মাদরাসা মাঠে লাখো কুরআনপ্রেমিক জনতার বুকফাটা আর্তনাদ, হৃদয়বিদারী কান্না আর চোখের পানিতে শিবির নেতা শহীদ আলী আজগর খান রাহাতকে চিরবিদায় জানালেন সিলেটবাসী। জানাযাপূর্ব সংপ্তি সমাবেশে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ছাত্রশিবির এবং ১৮ দলীয় জোট নেতৃবৃন্দের বক্তব্যে ডুকরে কেঁদে ওঠেন উপস্থিতি লাখো মানুষ। এ সময় সেখানে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। শহীদের পরিবারের সদস্য, সংগঠনের দায়িত্বশীল, আত্মীয়-স্বজন, শুভাকাড়ী ও বন্ধুদেরকে নির্বাক করে দিয়ে দ্বীনের পথে শাহাদাতবরণ করে মহান রবের কাছে চলে গেলেন শহীদ রাহাত। অনার্স চূড়ান্ত- বর্ষের ফলপ্রার্থী রাহাতকে শহীদ করার মাধ্যমে কুঁড়ি থেকে ফুল হওয়ার আগেই একটি সম্ভাবনাকে দুনিয়া থেকে বিদায় করা হলো। খুনিদের নির্মমতার জন্য আল্লাহর কাছে বিচার চাইলেন লাখো ধর্মপ্রাণ মুসল্লি। রাহাতের রেখে যাওয়া কাজ সম্পাদন করে বাংলার সবুজ ভূখণ্ডে ইসলামের পতাকা উড্ডীন করার মাধ্যমেই শহীদের রক্তের বদলা নেয়ার শপথ নেন তার সাথীরা।

কায়েস্তরাইল সমাজ কল্যাণ সমিতির নিন্দা ও শোক
সিলেট মহানগরীর ২৫ নম্বর ওয়ার্ডের দণি সুরমাস্থ কায়েস্তরাইল সমাজ কল্যাণ সমিতির সদস্য মদন মোহন কলেজের মেধাবী ছাত্র ও উদীয়মান সমাজসেবক আলী আজগর খান রাহাতের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন সমিতির নেতৃবৃন্দ।

শাহাদাতের পূর্বের স্মৃতি
আহত হওয়ার দুই দিন পূর্বে আঞ্জুমানের তাফসির মাহফিলে ঐতিহাসিক আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে ছিলেন রাহাত। রাহাতের এক সহযোদ্ধা জানান, তাফসির মাহফিলের অতিথি মাওলানা মুজাহিদুল ইসলাম যখন চারিত্রিক গুণাবলির পরীায় উত্তীর্ণ ব্যক্তিত্ব প্রখ্যাত মুফাসসিরে কুরআন আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর জন্য দোয়া করছিলেন তখন রাহাত হাউ মাউ করে কেঁদে তার শাহাদতের বাসনা মহান আল্লাহ রাব্বুল আল আমিনের দরবারে পেশ করছিলেন। পরদিন শনিবার বাসা থেকে রোজাদার অবস্থায় তিনি বের হয়ে ছাত্রশিবিরের মিছিলে যোগ দেন। পরিবারের কাছ থেকে জানা গেছে, রাহাত প্রায়ই রোজা রাখতেন। সর্বশেষ রোজাদার অবস্থাই তিনি পুলিশের গুলিতে আহত হন।

শহীদ আলী আসগর রাহাতের ফেসবুক থেকে
২ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ : শহীদের মিছিলে নাম লিখাতে এসো মুসলিম ভাই।

৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ : শাহাদাত আমার অতীব তৃষ্ণার পানি, পেছনে ফেরার কোন পথ আমি খোলা রাখিনি। ইয়া আল্লাহ তুমি কবুল করো।
৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ : ‘মরতেই হবে যখন শহীদি মরণ দিও আমাকে’।
১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ : ‘দিন এলো আবার, রক্ত ঝরাবার। জীবন দিয়ে শহীদ হয়ে বিজয় নিশান ওড়াবার’।
১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ : একটাই কামনা, একটাই স্বপ্ন, একটাই চাওয়া, একটাই মুক্তির পথ শহীদি মরণ।
১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ : আল্লাহ তুমি আমাকে দ্বীনের পথে শহীদ হবার তৌফিক দাও। আমিন।
১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ : আজ সারা বাংলাদেশে শহীদ হওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। হে আল্লাহ, তোমার অতি নগণ্য একজন বান্দা হিসেবে আমায় তুমি কবুল করো।

ব্যক্তিগত প্রোফাইল
নাম : শহীদ আলী আসগর খান রাহাত

পেশা : ছাত্র
জন্ম তারিখ ও বয়স : ১৯৯১ ইং, ২২ বছর

আহত হওয়ার তারিখ : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, বুকে গুলিবিদ্ধ
শাহাদাতের তারিখ : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, বেলা ১টা ৫ মিনিটে

স্থান : এ্যাপোলো হাসপাতাল, ঢাকা

দাফন করা হয় : পারিবারিক কবরস্থানে 
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম : কায়েস্তরাইল, ২৫ নম্বর ওয়ার্ড, ডাকঘর : দক্ষিণ সুরমা, থানা : সিলেট সদর, জেলা : সিলেট
পিতা : সোলেমান খান, ৬৫ বছর, আমেরিকা প্রবাসী
মাতা : নুরজাহান বেগম, ৫৫ বছর, আমেরিকা প্রবাসী
ভাইবোনের বিবরণ : সেলিম খান, সরকারি কর্মকর্তা (এটিও), শাকিল খান, আমেরিকা প্রবাসী, আলী আসগর খান রাহাত, শহীদ।

এক নজরে

পুরোনাম

শহীদ আজগর খান রাহাত

পিতা

সোলেমান খান

মাতা

নুরজাহান বেগম

জন্ম তারিখ

নভেম্বর ৩০, -০০০১

ভাই বোন

৩ ভাই ও ৪ বোনের মধ্যে সবার ছোট

স্থায়ী ঠিকানা

গ্রাম : কায়েস্তরাইল, ২৫ নম্বর ওয়ার্ড, ডাকঘর : দক্ষিণ সুরমা, থানা : সিলেট সদর, জেলা : সিলেট

সাংগঠনিক মান

সদস্য

সর্বশেষ পড়ালেখা

মদন মোহন কলেজ, ম্যানেজমেন্ট (অনার্স) ফাইনাল পরীক্ষার ফলপ্রথী

শাহাদাতের স্থান

ঢাকা মহানগরীর এ্যাপোলো হাসপাতালে


শহীদ আজগর খান রাহাত

ছবি অ্যালবাম: শহীদ আজগর খান রাহাত


শহীদ আজগর খান রাহাত

ছবি অ্যালবাম: শহীদ আজগর খান রাহাত